রবিবার, ২৮ Jun ২০২৬, ০৭:৫৫ অপরাহ্ন
এম এ সাত্তার:
জেলাজুড়েই বন বিভাগের জায়গায় অবাধে ঘরবাড়ি নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে এই বেআইনি কাজটি করা হচ্ছে অথচ তা প্রতিরোধে কারও কোনো উদ্যোগ নেই।
স্থানীয় লোকজন ছাড়াও বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা বহিরাগত লোকজন বনের জমিতে বাড়ি তুলে বসবাস করছে। আর এভাবে ঘর তোলার ক্ষেত্রে তাদের টাকার বিনিময়ে সহযোগিতা করছেন বন বিভাগেরই কর্মকর্তা/কর্মচারী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতারা।খোদ বন বিভাগের লোকজন এই অবৈধ কাজে সহযোগিতা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে এলাকাবাসীর।এই হলে বনের জমির অবৈধ দখল বাণিজ্য কে ঠেকাবে? এ তো শর্ষেতেই ভূত।
সদর উপজেলার পিএমখালী রেঞ্জের খুরুশকুলের গুচ্ছ গ্রাম, তেতৈয়া, রুহুল্লার ডেইল, ছনখোলা, ঘোনাপাড়া, ইউপাহাড়নূস ঘোনা, নাক্কাসাপাড়া, তোতকখালী, মাছুয়াখালী, ধাউনখালী আওতাভুক্ত গ্রামে বনবিভাগের জমিতে অনেক দিন ধরে অবৈধভাবে ঘরবাড়ি নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে গত কয়েক বছরে বনের জায়গায় ঘর তোলার সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েগেছে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বছর তিনেকের মধ্যেই নতুন করে শহস্রাধিক বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ছয় থেকে সাত সহস্রাধিক বাড়ি রয়েছে বনের জায়গায়। এভাবে বাড়ি নির্মাণ করার কারণে এই ইউনিয়নে (রেঞ্জ) বন বিভাগের সিংহভাগ জমি বেদখলে চলে গেছে বলে জানান স্থানীয়রা।
এলাকাবাসীর অভিযোগের ভিত্তিতে সরেজমিনে দেখা যায়, পিএমখালী রেঞ্জভূক্ত দিঘীরঘোনা বিট অফিসের আনুমানিক ১০০ গজ দূরত্বের মধ্যে মেইনরোড লাগোয়া বনবিভাগের জমিতে (পূর্বে কোন স্থাপনা ছিলনা) নতুন করে কয়েকটি ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে।এই জমিতে কে বা কারা ঘর নির্মাণ করছে জানতে চাইলে ঘর নির্মাণে কর্মরত এক শ্রমিক জানায় তারা অন্য এলাকার (বহিরাগত) মানুষ। এদেরকে ভালো করে সে চিনেন না। তবে জমিটি আগে ঘোনাপাড়া এলাকার স্থানীয় বদ’র (বদরুজ্জামান) পুত্র করিম উল্লাহর জবরদখলে ছিল।এই বিশাল জমিটি করিম উল্লার কাছ থেকে গন্ডা (২ শতক) ৮০ হাজার টাকা করে তারা কিনেছে বলে শুনেছি।সে কারো নাম (ক্রেতা) বলতে পারেনি।এ সময়ে ঘরে অবস্থানরত মহিলাদের কাছে জানতে চাইলে তারা এই ঘরের পাহারাদার হিসাবে রয়েছেন এবং আসল মালিক কক্সবাজারে থাকেন বলে জানায়। এ ব্যাপারে স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, বর্তমানে নির্মাণাধীন ওই ঘরে অবস্থানরতরা হলো জমি ক্রেতার ফ্যামিলির লোকজন। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তারা আপনার সাথে মিথ্যাচার করেছেন।
এ সময় স্থানীয় বিট অফিসে অবস্থান করছিল বিট অফিসার মোশাররফ।অবস্থান জানিয়ে তার সাথে ফোনে কথা বলার এক পর্যায়ে সাক্ষাৎ হয় প্রতিবেদকের সাথে।এমন সময়ে বিট অফিসারের সাথে চলার পথে ছনখোলা ঘোনাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামান্য পূর্বে মেইনরোড উপর ব্রিজে পাশে দাঁড়ানো হয়। এসময় বিট অফিসারকে বনের জমিতে নতুন ঘর নির্মাণ করার দৃশ্য ও স্থান দেখিয়ে দেয় প্রতিবেদক নিজেই।এ বিষয়ে সে জানায়, তাদেরকে ঘর না করতে কঠোর ভাবে নিষেধ করা হয়েছে। এরপরও তারা ঘর নির্মাণ অব্যাহত রেখেছেন। রেঞ্জ কর্মকর্তাকে এসব বিষয়ে অবহিত করেছেন।সে ছুটিতে আছেন, বিধেয় তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে পারছেনা।তিনি ছুটি থেকে আসলেই ওই জমি দখলমুক্ত করবেন। এরপর মাস অধিক গত হলেও জমিটি উদ্ধারের ব্যাপারে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি বিট অফিসার মোশাররফ।
উল্লেখ্য, বদলি হওয়া রেঞ্জ অফিসার জাহাঙ্গীর আলমের সময়ে জবর দখলদার কলিমুল্লাহ ওই বনের জমিতে লাখ টাকা ব্যয় করে পানের বরজের ছাউনী তৈরি করছিলেন। এই খবর জানার পর কোন কালক্ষেপণ না করেই তৎকালীন রেঞ্জ অফিসার জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে নতুন পানের বরজের ছাউনী কেটেকূড়ে ভেঙ্গে দিয়ে বনের জমিটি অবৈধ দখলমুক্ত করেছিলেন।
কক্সবাজার থেকে প্রকাশিত দৈনিক বিভিন্ন পত্রিকার খবর অনুযায়ী, জেলার অন্তর্গত জবরদখল হয়ে যায়নি এমন বনভূমির জমির দখলে থাকা নিষ্কন্টক ভূমি খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ আছে। আবার এমন কোন অক্ষত পাহাড়/ ঢিলা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়বে যেখানে ভূমিদস্যুদের কুড়ালের আঁচড় লাগেনি। বলতে গেলে বর্তমান এই সময়ের মধ্যেই সরকারি বনসম্পদের শতভাগই জবরদখলে চলে গেছে। এ ব্যাপারে স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও বনজঙ্গলে বসবাসরত অসংখ্য মানুষের সাথে কথা বলে কিছুসংখ্যক পরিবেশবাদী সাংবাদিকের একটি দলের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উল্লেখ্য এই চমৎকার তথ্যটি উঠে আসে।
জানা গেছে, জেলার বিভিন্ন রেঞ্জভূক্ত বনের জমিতে বাড়ি নির্মাণ ছাড়াও শিল্প প্রতিষ্ঠান, মৎস্য খামার, হ্যাচারিসহ অসংখ্য পোলট্রি ফার্ম গড়ে তোলা হয়। নির্মাণ করা হয়েছে কাঁচাপাকা সড়ক। এমনকি বনের জমি দখল করতে কোটি টাকার গাছ আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে। এসব কাজ করা হয় বন বিভাগের লোকজনের প্রকাশ্য মদদেই।একশ্রেণির প্রভাবশালী ব্যক্তির ভোগলিপ্সা ও বন রক্ষায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চরম দুর্নীতি, অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনাই বনাঞ্চল ধ্বংস হওয়ার প্রধান কারণ।এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বনাঞ্চল ধ্বংস করা হয়েছে।
পিএমখালী ইউনিয়ন কৃষকলীগের সভাপতি মোঃ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বনদখল দৌরাত্ম্য তো চলতে দেওয়া যায় না। বনভূমি রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। দখলকারী এবং তাদের মদদ দানকারীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি জনসচেতনতাও বাড়াতে হবে। জনসচেতনতা বৃদ্ধি পেলেই বন দখলদারদের প্রতিরোধ করা সহজ হবে। সচেতন নাগরিকদের দাবি বনবিভাগের বেদখল হয়ে যাওয়া জমিগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই উদ্ধার করতে হবে। পাশাপাশি দেশের অন্যান্য স্থানে দখল হয়ে যাওয়া বনভূমিও উদ্ধারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন সংশ্লিষ্ট প্রশাসন।শুধু তা-ই নয়, নতুন করে যাতে কেউ বন বিভাগের জায়গা দখল করতে না পারে, সেই ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নেবেন।
এ ব্যাপারে দিঘীরঘোনা বিট কর্মকর্তা মোশাররফ জানায়, বিষয়টি রেঞ্জ কর্মকর্তার নজরে আছে। তিনি অভিযানের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।শীঘ্রই বনের জমিতে উঠানো সব অবৈধ ঘরগুলো ভেঙ্গে দেয়া হবে।
ভয়েস/জেইউ।